আখেরি চাহার সোম্বা—এই শব্দটি বহু মুসলমানের কাছে পরিচিত, আবার অনেকের কাছেই রহস্যময়। বিশেষ করে উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে এই দিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা বিশ্বাস, লোকাচার ও সামাজিক অনুশীলন।
কেউ মনে করেন এটি অশুভ থেকে রক্ষার একটি প্রতীকী দিন, কেউ আবার একে নিছকই সামাজিক সংস্কৃতি হিসেবে দেখেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আখেরি চাহার সোম্বা শুধু একটি দিন নয়, বরং বিশ্বাস, ইতিহাস ও সমাজচর্চার মিলিত রূপ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কিছু অঞ্চলে এখনো আখেরি চাহার সোম্বা উপলক্ষে বিশেষ আমল, দোয়া বা সামাজিক আয়োজন দেখা যায়। তবে এই প্রচলনের ধর্মীয় ভিত্তি কী, ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে এর সম্পর্ক কতটা—এই প্রশ্নগুলো নিয়েই সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল রয়েছে।
এই লেখায় আমরা আখেরি চাহার সোম্বার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, এর সঙ্গে যুক্ত বিশ্বাস, মুসলিম সমাজে এর প্রচলন এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি কীভাবে দেখা হয়—সবকিছু নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিকভাবে আলোচনা করব।
আরও পড়ুনঃ শবে মেরাজ: মহানবী (সা.)–এর অলৌকিক সফরের স্মরণীয় রজনী
আখেরি চাহার সোম্বা বলতে সাধারণভাবে হিজরি বর্ষের সফর মাসের শেষ বুধবারকে বোঝানো হয়। ‘আখেরি’ অর্থ শেষ, ‘চাহার’ অর্থ চার এবং ‘সোম্বা’ অর্থ বুধবার—এই তিনটি শব্দ মিলিয়ে নামটির উৎপত্তি। মূলত সফর মাসের শেষ বুধবারকে কেন্দ্র করেই এই ধারণার জন্ম হয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে নাকি বিভিন্ন ধরনের বিপদ, রোগ বা অশুভ শক্তি সক্রিয় হয়, আবার একই সঙ্গে এই দিনটি পার হলে সেই বিপদের সময় শেষ হয়—এমন ধারণাও প্রচলিত।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, এই বিশ্বাসের সুস্পষ্ট কোনো কুরআনিক বা সহিহ হাদিসভিত্তিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং এটি ধীরে ধীরে মুসলিম সমাজে লোকজ বিশ্বাস ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। অনেক গবেষকের মতে, মধ্যযুগে মহামারি, প্লেগ বা আকস্মিক রোগব্যাধির সময় মানুষ নির্দিষ্ট দিনকে কেন্দ্র করে ভয় বা আশা তৈরি করত, সেখান থেকেই এমন ধারণার বিস্তার ঘটে।
আরও পড়ুনঃ শবে বরাত (লাইলাতুল বরাত): ক্ষমা ও ভাগ্য নির্ধারণের মহিমান্বিত রাত
মুসলিম সমাজে আখেরি চাহার সোম্বার প্রচলন মূলত দক্ষিণ এশিয়াকেন্দ্রিক। বাংলাদেশ, ভারতের কিছু অঞ্চল এবং পাকিস্তানে এই দিনের নাম শোনা যায় বেশি। কোথাও কোথাও মানুষ এদিন বিশেষ খাবার রান্না করে, কোথাও আবার দোয়া–মোনাজাতের আয়োজন হয়। কিছু এলাকায় শিশুদের নিয়ে আনন্দঘন পরিবেশও দেখা যায়, যা আসলে সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক পরিবার আখেরি চাহার সোম্বাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে। কেউ কেউ এদিন গোসল করাকে কল্যাণকর মনে করেন, আবার কেউ বিশেষ দোয়া পড়েন। তবে শহুরে শিক্ষিত সমাজে এই বিশ্বাসের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে। অনেকেই একে কেবল সংস্কৃতিগত বিষয় হিসেবে দেখেন, ধর্মীয় আমল হিসেবে নয়।
আরও পড়ুনঃ শবে কদর (লাইলাতুল কদর): হাজার মাসের চেয়েও উত্তম পবিত্র রজনী
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে সফর মাসকে বা এর কোনো নির্দিষ্ট দিনকে অশুভ মনে করার ধারণা সমর্থিত নয়। রাসুল (সা.) নিজেই বিভিন্ন হাদিসে সময়, মাস বা দিনকে অশুভ ভাবার কুসংস্কারকে নাকচ করেছেন। ইসলামী শিক্ষায় কল্যাণ ও অকল্যাণ সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, কোনো দিন বা তারিখের ওপর নয়। এই দিক থেকে আখেরি চাহার সোম্বাকে বিশেষ কোনো ধর্মীয় তাৎপর্য দেওয়া ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—সব সামাজিক রীতি বা সংস্কৃতি যে হারাম বা নিষিদ্ধ, এমন নয়। যদি কেউ এই দিনটিকে নিছক সামাজিক মিলন বা সাধারণ দোয়ার উপলক্ষ হিসেবে দেখে, তাতে ধর্মীয় সমস্যা নেই। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এটিকে বাধ্যতামূলক ধর্মীয় আমল বা অশুভ দূর করার নির্দিষ্ট উপায় হিসেবে বিশ্বাস করা হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সমাজে সচেতনতা বাড়ায় আখেরি চাহার সোম্বা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। অনেক আলেম ও চিন্তাবিদ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বোঝাচ্ছেন—ইসলামে অন্ধ বিশ্বাসের কোনো জায়গা নেই, বরং জ্ঞান ও সচেতনতার ওপরই ধর্মীয় জীবন গড়ে ওঠে। ফলে নতুন প্রজন্ম বিষয়টিকে প্রশ্নের চোখে দেখছে এবং যুক্তির আলোকে বিচার করছে।
আরও পড়ুনঃ ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সা.): মহানবী (সা.)–এর জন্ম ও জীবন আদর্শ
তবুও বাস্তবতা হলো, বিশ্বাস শুধু ধর্মীয় গ্রন্থ থেকেই আসে না, সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়েও গড়ে ওঠে। আখেরি চাহার সোম্বা তারই একটি উদাহরণ। এটি মুসলিম সমাজের একটি ঐতিহাসিক–সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, যাকে পুরোপুরি অস্বীকার না করে সঠিক প্রেক্ষাপটে বোঝাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
প্রশ্ন এবং উত্তর সমূহ
প্রশ্ন ১: আখেরি চাহার সোম্বা কি ইসলামের কোনো ফরজ বা সুন্নত আমল?
উত্তর: না, আখেরি চাহার সোম্বা ইসলামের কোনো ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নত আমল নয়। কুরআন ও সহিহ হাদিসে সফর মাসের শেষ বুধবারকে কেন্দ্র করে কোনো বিশেষ আমলের নির্দেশ পাওয়া যায় না। এটি মূলত সামাজিক ও লোকজ বিশ্বাস থেকে গড়ে ওঠা একটি ধারণা।
প্রশ্ন ২: সফর মাসকে অশুভ মনে করার ধারণা কি সঠিক?
উত্তর: ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো মাস বা দিন অশুভ নয়। রাসুল (সা.) স্পষ্টভাবে সময় ও তারিখকে অশুভ ভাবার কুসংস্কার বাতিল করেছেন। তাই সফর মাসকেও অশুভ মনে করার ধর্মীয় ভিত্তি নেই।
প্রশ্ন ৩: বাংলাদেশে আখেরি চাহার সোম্বার প্রচলন কেন বেশি দেখা যায়?
উত্তর: বাংলাদেশে এই প্রচলন মূলত ঐতিহাসিক ও সামাজিক কারণে গড়ে উঠেছে। গ্রামীণ সমাজে লোকবিশ্বাস দ্রুত ছড়ায় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা চলে আসে। ধর্মীয় শিক্ষার অভাবও এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
প্রশ্ন ৪: এদিন বিশেষ দোয়া বা মোনাজাত করলে কি গুনাহ হয়?
উত্তর: সাধারণ দোয়া বা আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করা সব সময়ই বৈধ। তবে যদি কেউ বিশ্বাস করে যে এই দিনের দোয়ার বিশেষ কোনো অতিরিক্ত ক্ষমতা আছে, তাহলে সেটি ভুল ধারণার মধ্যে পড়ে।
প্রশ্ন ৫: আখেরি চাহার সোম্বা পালন করা কি বিদআত?
উত্তর: যদি এটিকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় আমল হিসেবে বাধ্যতামূলক মনে করা হয়, তাহলে বিদআতের কাছাকাছি চলে যায়। কিন্তু সামাজিক রীতি হিসেবে পালন করলে সেটি ভিন্ন বিষয়।
প্রশ্ন ৬: শিশুদের আনন্দ আয়োজন বা খাবার বিতরণ কি অনুচিত?
উত্তর: শিশুদের আনন্দ দেওয়া বা খাবার বিতরণ নিজেই ভালো কাজ। তবে সেটিকে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা বা অশুভ দূর করার উপায় হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।
প্রশ্ন ৭: আলেমরা কেন আখেরি চাহার সোম্বা নিরুৎসাহিত করেন?
উত্তর: আলেমরা মূলত ভুল আকিদা ও কুসংস্কার থেকে মানুষকে দূরে রাখতে চান। কারণ এসব বিশ্বাস ধীরে ধীরে ইসলামের মৌলিক শিক্ষাকে আড়াল করে ফেলে।
প্রশ্ন ৮: সামাজিক সংস্কৃতি আর ধর্মীয় আমলের পার্থক্য কীভাবে বুঝব?
উত্তর: যেসব বিষয় কুরআন ও হাদিসে নির্দিষ্টভাবে এসেছে সেগুলো ধর্মীয় আমল। আর যেগুলো সমাজে মানুষের অভ্যাস থেকে এসেছে, সেগুলো সংস্কৃতি—এই পার্থক্য বোঝাই মূল চাবিকাঠি।
প্রশ্ন ৯: আখেরি চাহার সোম্বা নিয়ে ভিন্নমত থাকা কি স্বাভাবিক?
উত্তর: হ্যাঁ, এটি স্বাভাবিক। কারণ বিষয়টি ধর্মীয় মূলনীতি নয়, বরং ব্যাখ্যাভিত্তিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটনির্ভর।
প্রশ্ন ১০: একজন সচেতন মুসলমান হিসেবে আমাদের করণীয় কী?
উত্তর: সচেতন মুসলমান হিসেবে আমাদের উচিত কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে বিশ্বাস গড়ে তোলা, কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা এবং সামাজিক রীতিকে ধর্মের সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলা।
শেষ কথা
সবশেষে বলা যায়, আখেরি চাহার সোম্বা মুসলিম সমাজে প্রচলিত একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ধারণা, যার সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসের মিশ্রণ ঘটেছে। ইসলামের মূল শিক্ষা অনুযায়ী কোনো দিন বা মাস নিজে থেকে অশুভ বা শুভ নয়। তাই এই বিষয়টিকে অন্ধ বিশ্বাস নয়, বরং সচেতনতা ও জ্ঞানের আলোকে বোঝাই সবচেয়ে নিরাপদ ও সঠিক পথ।